৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং, শুক্রবার, ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজঃ

কুরবানির গুরুত্বপূর্ণ মাসায়িল ও বিধি-বিধান

কুরবানির গুরুত্বপূর্ণ মাসায়িল ও বিধি-বিধানঃ

কুরবানী ইসলামের অন্যতম নিদর্শন। কুরবানীর হুকুম সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ؕ
অর্থঃ অথএব, তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর। – (সূরা কাউছার ২ আয়াত)।
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন-
قُلْ اِنَّ صَلَاتِىْ وَنُسُكِىْ وَ مَحْيَاىَ وَمَمَاتِىْ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَۙ.
অর্থঃ বল, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ জগত সমূহের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালারই জন্য৷ – (সূরা আনআম ১৬২ আয়াত)।
মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন-
وَلِكُلِّ اُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِّيَذْكُرُوا اسْمَ اللّٰهِ عَلٰى مَا رَزَقَهُمْ مِّنْۢ بَهِيْمَةِ الْاَنْعَامِ ؕ
অর্থঃ আমি প্রত্যেক জাতীর জন্য কুরবানী নির্ধারন করে দিয়েছি৷ যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরুপ যেসব চতুষ্পদ জন্তুু দিয়েছি, তা যবেহ করার মাধ্যমে যেন আল্লাহর নাম উচ্চারন করে৷ – (সুরা হজ ৩৪ আয়াত)
মহান আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন-
لَنْ يَّنَالَ اللّٰهَ لُحُـوْمُهَا ولا دماءها ولكن يناله التَّقْوٰى مِنْكُمْ‌ؕ
অর্থঃ তোমাদের কুরবানীর পশুর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া৷ – (সুরাহ হজ ৩৭)।

হাদীস শরীফে এসেছে, عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال من كان له سعة ولم يضح فلا يقربن مصلانا
অর্থঃ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ‘যার কুরবানীর সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে। – (’সুনানে ইবনে মাজা হাদীস নং ৩১২৩/ মুসনাদে আহমদ হাদীস নং ৮০৭৪/-মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৩৫১৯; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫)।

আর ইবাদতের মূলকথা হল আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যেকোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরি।
১.ইখলাস (اخلاص) তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা।

২.শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক মাসায়েল অনুযায়ী সম্পাদন করা।

এ উদ্দেশ্যে এখানে কুরবানীর কিছু জরুরি
মাসায়েল উল্লেখ করা হল।

১.মাসআলাঃ
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।

আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। – (আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫)।

২.মাসআলাঃ (নেসাবের মেয়াদ কাল)
কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে। – (বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২পৃঃ)।

৩.মাসআলাঃ
মুসাফিরের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। তবে যে সকল হাজী মক্কা, মিনা ও মুযদালিফায় কুরবানীর সময় ১৫ দিন থাকবে তারা মুকীম। নেসাবের মালিক হলে হজ্বের কুরবানী ব্যতীত ঈদুল আযহার কুরবানীও তাদের উপর ওয়াজিব হবে৷ – (সহীহুল বুখারী ৫৫৪৮ হাদীস৷ ইমদাদুল ফতোয়া ২/১৬৬ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৪পৃষ্ঠা)।

৪.মাসআলাঃ
কুরবানী যাদের উপর ওয়াজিব নয়ঃ
নাবালেগ ও পাগল নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। তবে তাদের অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে থেকে কুরবানী করলে সহীহ হবে৷ – (ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৫ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬ পৃষ্ঠা)।

৫.মাসআলাঃ
যে ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। – (ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৪, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫
নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী)।

৬.মাসআলাঃ
নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া অভিভাবকের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব। – (রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৫; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫)।

৭.মাসআলাঃ
দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২
৮.মাসআলাঃ
গরীব মিসকিন বা নেসাবের মালিক নয় এমন ব্যক্তির উপরও কুরবানী ওয়াজিব নয়। তবে তারা কুরবানী করলে সহীহ হবে৷ – (বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২ পৃষ্ঠা৷ আশরাফুল হিদায়া ৯/৬৬৭ পৃষ্ঠা৷ আল কুদুরী ২/২৩৮ পৃষ্ঠা)।

ফেসবুকে লাইক দিন