৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং, শুক্রবার, ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজঃ

সরকারী সহকারী প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য,  ড.জাফর ইকবালের কলাম এবং গল্পান্তর

আবু জাফর রেহমানঃ বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য বিগত প্রায় ৬-৭ বছর ধরে চলমান। প্রধানমন্ত্রী’র একটি মাত্র ঘোষণায় রেজিস্ট্রাট/বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক আন্ডার ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষকও অনেকটা রাতারাতি জাতীয় করণের আওতায় এসে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছের মতো সৌভাগ্যবান হয়েছেন। অন্য একটি ঘোষণায় প্রধান শিক্ষকগণ রাতারাতি বেতন গ্রেড এর  ৩-৪ ধাপ টপকে দশম গ্রেডে বেতন পাওয়ার উপযুক্ত হয়ে গেলো। অথচ সহকারী শিক্ষকগণ একই সময় থেকেই ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার হয়ে রইলেন।

সহকারী শিক্ষকরাই একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ তারা বিগত ৬-৭ বছর ধরে বঞ্চনার শিকার। উল্লেখিত সময়ের আগে প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী শিক্ষকদের সমন্বয়ে মাত্র ২-৩ টি শিক্ষক সংগঠন ছিলো। এবং শিক্ষকদের প্রায় সকল দাবি ও অনেকটা একসূত্রে গাঁথা ছিলো।ফলে দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন -সংগ্রাম,সমর্থন আদায় ও প্রায় একসাথে এক মঞ্চেই হতো। এ রকম ধারাবাহিক আন্দোলন  চলাকালে ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী  হঠাৎ প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে বেতন দেওয়ার কথা ঘোষণা  করেন। আন্দোলনে সিংহভাগই ছিলো সহকারী শিক্ষক। কিন্তু প্রধান শিক্ষক গণ নিজেদের টা পেয়ে সহকারী শিক্ষকদের দাবিগুলো নিয়ে কোন বাক্য ব্যয় তো করেনই নি, বরং সহকারীদের দাবিগুলো আদায় না হওয়ার বা বানচাল করার চেষ্টাই অব্যাহত রাখে।ফলে প্রধান শিক্ষক আর সহকারী শিক্ষকদের আলাদা আলাদা অনেকগুলো  সংগঠন নিবন্ধিত হয়।

সহকারী শিক্ষকদের সংগঠন গুলো প্রাথমিক শিক্ষক মহাজোট ও প্রাথমিক শিক্ষক ঐক্যজোট এ দুটি ব্যানারে দাবি আদায়ে জেলা -উপজেলা এবং ঢাকায় গিয়ে প্রথম দিকে অনেক গুলো শিক্ষক সমাবেশ ও আন্দোলন পরিচালনা করেন। এ সকল সমাবেশে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতৃবৃন্দ সহকারী শিক্ষকদের প্রধান দাবি প্রধান শিক্ষকদের পরের ধাপ অর্থাৎ ১১তম ধাপে বেতন নির্ধারণ করার পক্ষে সমর্থন ও আশ্বাস দিলেও, পরে সরকার সহকারী প্রধান শিক্ষকের একটি নতুন  পদ সৃষ্টির বাহানা তুলে ১১তম গ্রেড তাদের জন্য বরাদ্দ রাখার কথা বলে সহকারী শিক্ষক দের ১২ তম গ্রেড নির্ধারণের আশ্বাস দেন। কিন্তু পরবর্তী তে শিক্ষক সংগঠনগুলোর নড়-বড়ে অবস্থা দেখে ১২তম গ্রেড থেকে সরে গিয়ে ১৩ তম গ্রেড দেওয়ার  আদেশ জারি করে।কিন্তু ১৩ তম গ্রেডে নিম্নধাপে ফিক্সেশন করলে অনেক শিক্ষকের বেতন পূর্বের চেয় কমে যায় বিধায় উচ্চধাপে ফিক্সেশন করার আদেশ জারি করেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় অক্টোবর ২০২০এর আগে এ ফিক্সেশন চূড়ান্ত হওয়ার কথা থাকলেও সফটওয়্যার সমস্যার কারণে এখনও তা বাস্তবায়ন  সম্ভবপর হয় নি। গ্রাম প্রধান বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাই দেশের সকল জনগণের শিশু শিক্ষার জন্য নির্ভর যোগ্য মাধ্যম।

ডিজিটাল মিডিয়ার বদৌলতে জানতে পারি অনেক দেশে অন্য সরকারি চাকরির চেয়ে শিক্ষকদের বেতন সবচেয়ে বেশি, অথচ বাংলাদেশে শিক্ষকরাই অবহেলিত।

বাংলাদেশের বিখ্যাত পরিবারের একজন বিখ্যাত লেখক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ ড.জাফর ইকবাল স্যার তার লেখায় প্রাথমিক শিক্ষকদের অবহেলা ও নিগ্রহের কথা অত্যান্ত মর্মদায়ক ভাবে উপস্থাপন করেছেন অনেকবার।

তার ভাষায়-“আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কিন্তু যখন  আমি শিক্ষক নিয়ে কথা বলতে চাই, তখনই সবার প্রথমে আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা মনে পড়ে। দেশের মানুষ কি এখনও জানে যে, এই দেশের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা এখনো ৩য় শ্রেণির কর্মচারী?

বেশিরভাগ সময় প্রাথমিক শিক্ষকদেরকে দিয়ে দেশের যত ‘ফালতু’ কাজ সব কিছু করানো হয়। গ্রামের সেনিটারি ল্যাট্রিন গোনা থেকে ভোটার তালিকা তৈরি করা পর্যন্ত – এমন কোন কাজ নেই যা প্রাথমিক শিক্ষকদের দিয়ে করানো হয় না।
এই দেশে সম্ভবত প্রায় আশি হাজার প্রাইমারি স্কুল আছে। এই স্কুলের শিক্ষকদের থেকে অসহায় কোনো গোষ্ঠী এই দেশে আছেন বলে আমার জানা নেই। তাই আমি যখনই শিক্ষকদের নিয়ে কিছু বলতে চাই তখনই প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের কথা একটিবার হলেও স্মরণ করে নিই।”

পরিশেষে একটি গল্প বলে আজকের লেখা শেষ করবো।

একদেশে একব্যবসায়ীর ছয় ডজন ছাগল ও একডজন গরু ছিলো। তিনি তার পশুগুলোর খাবার ও পরিচর্যার জন্য প্রত্যহ একঘন্টা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে একজন কর্মচারী নিয়োগ করলেন।কর্মচারী গরুগুলোর সহজেই খৈল, ভুশি, ভাত ও ভাতের মাড় যোগার করে খাওয়াতে পারতেন। কিন্তু ছাগলের খাবার যোগার করা ছিলো তার জন্য  খুবই কঠিন। কারণ একে তো ছাগলের সংখ্যা বেশি,তার উপর ঘাস, নরম ডগা ও লতা-পাতা অল্প সময়ে যোগার করা বেশ কঠিন। ফলে খাবারে বিঘ্ন ঘটায় ছাগল গুলোর দৈহিক দৈন্যদশা বাড়তে লাগলো।

হঠাৎ সে দেশের রাজা প্রজাদেরকে পশু পালনে উদ্ধুদ্ধ করার জন্য ঘোষণা দিলেন, যাদের ঘরে একশো ‘টির উপর হৃষ্টপুষ্ট গৃহপালিত পশু পাওয়া যাবে তাদের লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। ঐ ব্যবসায়ী চিন্তা করলেন তার তো একশোর চেয়ে কিছু পশু কম আছে, তাই একশো পূর্ণ করার জন্য তিনি রাস্তা থেকে কিছু বেওয়ারিশ কুকুর ধরে এনে তার গৃহপালিত পশুর লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
পশুগুলোর মালিক পুরস্কার পাওয়ার জন্য মনোনিত হবে এমন সময় বিচারকদের একজন ছাগলগুলোর শারীরিক অপুষ্টতার কারণ দেখিয়ে তার পুরস্কার বাতিল করে দিলেন। বর্তমানে আমাদের সহকারী শিক্ষকদের অবস্থা ও অনেকটা এ রকমই।

শ্রদ্ধেয় ড.জাফর ইকবাল স্যার যদি এ হেন বৈষম্যের কথা সবিস্তারে জানতেন, তিনি তা ও তুলে ধরতে পিছ পা হতেন না।

-আবু জাফর রেহমানঃ  শিক্ষক, লেখক ও সংগঠক।

চার পাঁচজন শিক্ষক একই পদে যেতে চাইলে সফটওয়্যার যাকে মনে করবে অনুমোদন দেবে

প্রাথমিকে ২৫ হাজার ৩০০ ও ১০ হাজারের বিশাল নিয়োগ

প্রাথমিক শিক্ষকদের স্কুলে আসতে নির্দেশনা জারি করা হয়নি

ফেসবুকে লাইক দিন