২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং, মঙ্গলবার, ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ

দৈনিক বিদ্যালয় :: বিগত ১১ জানুয়ারি-২০২১ তারিখে বাংলাদেশ মাদ্রাসা জেনারেল টিচার্স এসোসিয়েশনের পক্ষথেকে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে ৫ দফা দাবি জানানো হয় এবং দাবি পূরণে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ পুনঃসংশোধনেরও দাবি জানান সংগঠনটি। তাদের এই দাবি গুলোর অন্যতম দুটি দাবি ছিল- প্রশাসনিক পদে (সুপারিন্টেন, অধ্যক্ষ বা প্রতিষ্ঠান প্রধান ইত্যাদি পদে) পদোন্নতির সুযোগ (১নং দাবি) ও মাদ্রাসায় সহঃ গ্রন্থাগারিক ও গ্রন্থাগারিক পদে সাধারণ ধারার (জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত) শিক্ষার্থীদের আবেদনের সুযোগ প্রদান(দাবি নং-৫)।

পক্ষান্তরে সংবাদ সম্মেলনের উক্ত দাবি ২টিকে উদ্ভট, অযৌক্তিক ও অবান্তর বলে মন্তব্য করে বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক কর্মচারীদের অপর সংগঠন জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহাসচিব মাওলানা শাব্বির আহমদ মোমতাজী এবং সভাপতি এ এম এম বাহাউদ্দীন। তাদের বিবৃতিটি ১৪ জানুয়ারি-২০২১ তারিখ দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় “মাদরাসা শিক্ষাবিরোধী ষড়যন্ত্র সফল হতে দেবো না” শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের পক্ষে প্রদেয় বিবৃতিটির একাধিক অংশে সাধারণ ধারার শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের বারবার অবজ্ঞা ও হেয় করা হয়েছে এবং ষড়যন্ত্রকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পাশাপাশি এ ধারার শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ষড়যন্ত্রকারী ও ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে অবহিত করে উস্কানিমূলক বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। যা একজন জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত এবং দেশের নাগরিক হিসেবে আমার জন্য এবং দেশের সকল সাধারণ ধারার শিক্ষার্থী-পেশাজীবীদের জন্য চরম লজ্জাজনক ও সম্মানহানীকর বলে আমি মনে করি।

নিম্নে তাদের বিবৃতির উল্লেখযোগ্য অংশ ও তার প্রতিবাদের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো-

১. জমিয়াতুল মোদার্রেছীন নেতৃদ্বয় মাদরাসার প্রশাসনিক পদে সবার পদোন্নতি ও অংশগ্রহণের দাবিকে তারা মাদ্রাসা ধ্বংসের চক্রান্ত বলে আখ্যা দেন, পাশাপাশি এ দাবিকে ভারতের মাদ্রাসা বন্ধ করার সমতুল্য চক্রান্তের সাথে তুলনা করেন তারা।
এই বক্তব্যটি দ্বারা তারা জেনারেল শিক্ষক- পেশাজীবীদের শান্তিপূর্ণ ও অহিংস দাবিকে ধর্মীয় উস্কানীতে রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা করেছেন।

২. বিবৃতির পরে অংশে ভুল তথ্য দিয়ে বলা হয়- “সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব সাধারণ শিক্ষিতরা যেভাবে পালন করে থাকেন, ঠিক এভাবেই মাদরাসা শিক্ষার প্রশাসনিক দায়িত্ব মাদরাসা শিক্ষিতদের হাতেই থাকা সমীচীন”।
উক্তিটি সঠিক নয়, কারণ দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য সকল ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক পদে সবার অংশগ্রহণ ও পদোন্নতির সুযোগ বিদ্যমান। স্কুল-কলেজের নীতিমালায়ও সবার সমান সুযোগের বিধান আছে। কিন্তু মাদ্রাসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কতিপয় বিষয়ধারী শিক্ষিকদের জন্যই শুধুমাত্র প্রশাসনিক পদগুলো সংরক্ষিত।

৩. নেতৃদ্বয় দাবি করেন- “দেশে কর্মসংস্থান না থাকায় কিংবা তারা (জেনারেলরা) কোন উপযুক্ত স্থানে নিযুক্ত হতে না পারায় মাদ্রাসায় চাকরি নিয়েছেন।” এর দ্বারা তারা জেনারেল শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষিতদের কটাক্ষ ও অপমান করেছেন। যা তাদের অপেশাদারী ও হিংসাত্মক মনোভাবের পরিচয় বহন করে। অথচ দেশের সকল চাকুরি ক্ষেত্রেই জেনারেল শিক্ষিতদের আধিপত্য লক্ষণীয়। তারা মেধা দিয়েই মাদ্রাসায় নিয়োগ নিয়েছেন, কারো অনুগ্রহে নয়।

৪. জেনারেল টিচার্স এসোসিয়েশনের ৫নং দাবি ছিল- মাদ্রাসায় গ্রন্থাগারিক ও সহঃ গ্রন্থাগারিক পদে জেনারেল শিক্ষিতদের আবেদনের সুযোগ প্রদান”- জমিয়াত নেতৃদ্বয় এটাকে “একটি অযৌক্তিক ও অবান্তর দাবি” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা মাদ্রাসার আরবি-ফার্সি ভাষায় বইয়ের রিফারেন্স দিয়ে বলেছেন শুধু মাদ্রাসায় উচ্চ শিক্ষায় (ফাজিল-কামিল-আরবি বিষয়) শিক্ষিতরাই শুধু পদটির জন্য যোগ্য।

অথচ তারা কৌশলে এড়িয়ে গেছেন যে আরবি ফার্সি সংশ্লিষ্ট কিতাব ও রিফারেন্স বই সমূহ শুধু উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রযোজ্য। দেশের দাখিল-আলিম পর্যায়ের কুরআন-হাদিস সংশ্লিষ্ট মুষ্টিমেয় ৩-৪টি বই আছে, সেগুলো NCTB অনুমোদিত ও আরবি-বাংলা সংমিশ্রিত ভাবে রচিত, তাই জেনারেল শিক্ষিতদের পক্ষে সাজ-সজ্জা ও রক্ষণাবেক্ষণ অসম্ভব কিছুই না। তাছাড়া ফাজিল-কামিল পর্যায়ে আরবি-ফার্সি বইয়ের আধিক্য অস্বিকার করার মত না, তবে দাখিল-আলিম পাশ বা আরবি ফার্সি ভাষার স্বল্প-মেয়াদী কোর্স করেও একজন জেনারেল শিক্ষিত মাদ্রাসার গ্রন্থাগার পরিচালনা করতে সক্ষম।

আরও উল্লেখ্য যে- একটা গ্রন্থাগারে শুধু আরবি ফার্সি নয় বরং বিশ্বের যেকোনো নামি-দামি ভাষার বই ও প্রাচীন সংগ্রহ থাকতে পারে এবং সেগুলোর সাজ-সজ্জা ও রক্ষণাবেক্ষণের একাধিক পদ্ধতিও গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের শিখানো হয়। আবার আরবি বই শুধু মাদ্রাসায় নয় দেশের সকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে আছে সেখানে জেনারেলসহ সকল ধারার গ্রন্থাগারিকগণ সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন, অর্থাৎ সহঃ গ্রন্থাগারিক ও গ্রন্থাগারিকের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি মৌলিক ব্যাপার নয়, মৌলিক ব্যাপার হলো সংশ্লিষ্ট বিষয়ে (গ্রন্থাগার বিজ্ঞান) ডিপ্লোমা বা মাস্টার্স।

উল্লেখ্য করা বাঞ্চনীয় যে, সহঃ গ্রন্থাগারিক পদটির নিয়োগে সমমান যোগ্যতার জন্য জেনারেল শিক্ষিত ডিপ্লোমাধারীগণও বহুদিন ধরে দাবী জানিয়ে আসছে এবং আইনী প্রক্রিয়ার দাবি আদায়ের চেষ্টা করছে।

৫. জমিয়াত নেতৃদ্বয় দাবি ২টিকে ইসলাম বিদ্বেষী ও বৃহৎ ষড়যন্ত্রের অংশ বিশেষ দাবি করে হুশিয়ারি দিয়ে বলেন- “আলেম ওলামা পীর মাশায়েখগণ এসব বরদাশত করবে না” তাঁদের এহেন বক্তব্য যথেষ্ট উস্কানিমূলক। তারা একটি পক্ষের যৌক্তিক ও শান্তিপূর্ণ দাবিকে ধর্মীও উস্কানিতে পরিণত করে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির অপচেষ্টার করছে মাত্র।

সর্বোপরি মাদ্রাসা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও এর স্তরভেদে ৫০-৮০% বই ও বিষয় জেনারেল শিক্ষা ভিত্তিক (বিশেষ করে দাাখিল-আলিম পর্যায়ে) এবং মাদ্রাসাশিক্ষার মানোন্নয়নে আরবি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক-পেশাজীবীদের পাশাপাশি জেনারেল শিক্ষিত শিক্ষক-পেশাজীবীদের প্রয়োজনীয়তা বাধ্যতামূলক। মাদ্রাসাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে জেনারেল শিক্ষক-পেশাজীবীদের অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমান সরকারও মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার জন্য বদ্ধপরিকর, জেনারেল ও কারিগরি জ্ঞান ব্যতিত মাদ্রাসা শিক্ষা অসম্পূর্ণ।

তাই জেনারেল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার বলে সরকার বা সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে করা অহিংস ও শান্তিপূর্ণ দাবিগুলোকে ষড়যন্ত্র বলে বিবৃতি দেওয়া, ইসলাম ধ্বংসের চক্রান্ত বলে অবহিত করা, বরদাশত-অবান্তর-পাঁয়তারার মত শব্দ ব্যবহার করে কাউকে কটাক্ষ করা এবং ধর্মপ্রাণ সাধারন মুসলমানদের মনে উস্কানিমূলক মনোভাব সৃষ্টি ইত্যাদি অবশ্যই জমিয়াতুল মোদার্রেছীন সংগঠনটির অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া কিছুই না। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে এটি সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টিরই অপচেষ্টা। জেনারেল শিক্ষক এসোসিয়েশনের দাবিগুলো সম্পূর্ণ সরকারের বিবেচনার বিষয় তাহলে তারা কেনো গায়ে পরে এসে কথা বলছে তা বোধগম্য নয়। এতে সংগঠনটির অপেশাদারী মনোভাব ও পক্ষপাতদুষ্ট উদ্দেশ্য প্রকাশ পেয়েছে।

তাই একজন জেনারেল শিক্ষিত এবং গ্রন্থাগার বিজ্ঞান ডিপ্লোমার শিক্ষার্থী হিসেবে, একই সাথে সকল জেনারেল শিক্ষিত ও গ্রন্থাগার বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে “জমিয়াতুল মোদার্রেছীন” সংগঠনটির পক্ষে বিবৃতি প্রদানকারী ব্যক্তিদ্বয়ের এহেন অপেশাদারী মনোভাব, অনাধিকার চর্চা, হিংসাত্মক ও উস্কানিমূলক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাই এবং প্রকাশ্যে তাদের ভুল স্বীকার করে তাদের বক্তব্য পরিহারের ঘোষণা চাই।

-সাধারণ ধারায় শিক্ষিত ও গ্রন্থাগার বিজ্ঞান ডিপ্লোমাধারীদের পক্ষে, মোঃ আবু বক্কর সিদ্দিক
(জেনারেল শিক্ষিত ও গ্রন্থাগার বিজ্ঞান ডিপ্লোমা শিক্ষার্থী)।

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন

ফেসবুকে লাইক দিন