২০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং, মঙ্গলবার, ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

গ্রন্থাগারিক ও সহকারী গ্রন্থাগারিক পদ বনাম জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮

বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষুধা ও দারিদ্র্যতামুক্ত, শোষন-বৈষম্যহীন যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তাঁরই সুযোগ্য কন্যা, জনদরদী নেত্রী, মানবতার মা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে তা আজ বিশ্বের বুকে একটি মডেল রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। বর্তমান সরকারের সাফল্য ও অগ্রযাত্রার অন্যতম ক্ষেত্র হলো শিক্ষা খাত। শিক্ষাখাতে এসরকারের উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বিশেষ অবদান হলো “বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮” অনুমোদন। সামগ্রিকভাবে এটি খুব ইতিবাচক ব্যাপার হলেও কিছুক্ষেত্রে এই নীতিমালাটি জটিলতারও সৃষ্টি করেছে। সৃষ্ট জটিলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম দুটি জটিলতা হলো- মাদ্রাসায় গ্রন্থাগারিক ও সহকারী গ্রন্থাগারিক নিয়োগে পূর্বের নীতিমালায় থাকা সমমান যোগ্যতা বাতিলকরণ। বর্তমানে পদ দুটি শুধু মাদ্রাসা শিক্ষিতদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রন্তাগারিক পদটির জন্য যোগ্যতা রাখা হয়েছে কামিল বা আরবি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে ডিপ্লোমা এবং সহকারী গ্রন্থাগারিক পদটির জন্য যোগ্যতা রাখা হয়েছে ফাজিল বা আরবি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি এবং গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে ডিপ্লোমা। কিন্তু পূর্বে পদ দুটির জন্য সকল বিষয়ে স্নাতক বা সমমান ডিগ্রি ছিল, ফলে জেনারেল শিক্ষিতদের জন্য নিয়োগে সমান সুযোগ ছিল। কিন্তু নতুন নীতিমালায় মাদ্রাসার জন্য পদ দুটির যোগ্যতা পরিবর্তনের ফলে রাতারাতি জেনারেল শিক্ষিত হাজার হাজার ডিপ্লোমাধারীর কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মুখে পরে যায়। তাঁদের স্বপ্ন পূরনের পথে তৈরী হয় বৈষম্যের দেয়াল।

সমমান বাতিল বৈধ নাকি বৈষম্যঃ
★গ্রন্থাগারিক ও সহকারী গ্রন্থাগারিক পদ দুটি টেকনিক্যাল পদ অর্থাৎ পদদুটি কারিগরি শ্রেণির আওতাভুক্ত। কারিগরি পদসমূহে চাকরির প্রধান শর্তই হলো সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অর্জিত সনদ। তাছাড়া পদদুটি হলো নন-টিচিং বা স্টাফ পদ। আর স্টাফ পদগুলোর শিক্ষাগত যোগ্যতা সবসময় সমমান হয়।
• উক্ত পদদুটির জন্য ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতায় সমমান চাওয়া হয়। আর কোর্সটিতে সবাইকে একই বিষয়ে, একই পদ্ধতিতে শিক্ষাদান করা হয়। একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়, সনদপত্রও সবার জন্য সমান।
• পূর্বের সকল নীতিমালায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পদদুটির যোগ্যতা সমমান ছিল। আবার বর্তমান নীতিমালাটির শুধু মাদ্রাসা অংশ বাদে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য এখনো সমমান ডিগ্রি বহাল আছে।
• সরকারি ঘোষণা মতে স্নাতক ও ফাজিল এবং স্নাতকোত্তর ও কামিল সমমান ডিগ্রি। কিন্তু এক্ষেত্রে তা আলাদা করে দেখানো হয়েছে।
• মাদ্রাসায় গ্রন্থাগারিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কামিল অথবা আরবি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে ডিপ্লোমা চাওয়া হয়েছে। কিন্তু পদটির জন্য এরূপ যোগ্যতা গ্রহণযোগ্য নয়।গ্রন্থাগারিক একটি উচ্চতর পদ হওয়ায় এর জন্য শুধু ১ বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা নয়, অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রয়োজন।
• গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্য এবং এর চাকুরির ক্ষেত্র মাত্র একটিই- তা হলো গ্রন্থাগারিক বা সহকারী গ্রন্থাগারিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।
• দেশের স্কুল- কলেজগুলোতে আগে থেকেই পদদুটির জন্য জনবল নিয়োগ করা আছে। তাই এ কোর্সের সকল শিক্ষার্থীই মাদ্রাসায় সৃষ্টপদে চাকুরির আশায় কোর্সটি করেছেন বা করছেন।
অতএব, উপরের আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, মাদ্রাসায় গ্রন্থাগারিক ও সহকারী গ্রন্থাগারিক নিয়োগে সমমান যোগ্যতা বাদ দেওয়াটা স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক। সমমান যোগ্যতা বাতিল করার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাও কোথাও দেওয়া হয়নি। তবে নীতিমালা প্রণয়ন সংশ্লিষ্ট একাধিক পক্ষের সাথে আলোচনা করে জানা যায়- নীতিমালায় পদদুটির জন্য এরূপ যোগ্যতা রাখার একটাই কারণ তা হলো মাদ্রাসার ‘আরবি’ বই- যা জেনারেল শিক্ষিতরা রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবেনা বলে ধারণা করা হয়েছে। এখন আরবি বই যদি জেনারেল শিক্ষার্থীদের অযোগ্যতার প্রধান কারণ হয় তাহলে প্রশ্ন থাকে- গ্রন্থাগারে শুধু আরবিই নয় বরং বিভিন্ন ভাষার বইও থাকতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে ২৩টিরও অধিক ভাষার বই আছে, তাহলে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কি ২৩ ভাষা বিশারদ গ্রন্থাগারিককে নিয়োগ করা প্রয়োজন নাকি ২৩টি আলাদা ভাষার বইয়ের ২৩জন গ্রন্থাগারিক নিয়োগ প্রয়োজন? না, এরকম কিছু মোটেও সম্ভব ও গ্রহণযোগ্য নয়। আবার উক্ত পদদুটির নিয়োগ যোগ্যতায় সমমান না রাখা যদি যুক্তি সঙ্গত বলে মনে করা হয় তাহলে মেডিক্যাল কলেজগুলোর জন্য ডাক্তারকে, বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বিজ্ঞান বিভাগের এবং কমার্স শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীকেই শুধু যোগ্য ঘোষণা করা উচিত। অর্থাৎ স্কুল কলেজের জন্যও মাদ্রাসা শিক্ষিতদের অযোগ্য ঘোষণা করা উচিত।

তবে মাদ্রাসা শিক্ষার উচ্চস্তর অর্থাৎ ফাজিল-কামিল পর্যায়ে আরবি বিষয়ের আধিক্যের কথা অস্বিকার করা যায় না। কিন্তু দাখিল-আলিম পর্যায়ে শ্রেণিভিত্তিক মাত্র ২-৩টি করে আরবি বই আছে যা NCTB কর্তৃক মুদ্রিত। এসব বইয়ের কভার পৃষ্ঠায় বইটির নাম-শিরোনাম বাংলায় দেওয়া আছে। ফলে জেনারেল শিক্ষিতরাও তা সহজেই রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবেন। তাই এরূপ সমস্যার সমাধানে সরাসরি শিক্ষা সনদকে অবমূল্যায়ন না করে কিছু বিকল্প ও সকলের জন্য গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ সুপারিশ করা যায়। যেমন-
১. পদদুটির জন্য সমমান সুযোগ রেখে জেনারেল শিক্ষিতদের জন্য আরবি দক্ষতা অর্জনের কোন কোর্স সম্পন্ন করার নির্দেশ প্রদান করা। যা একজন শিক্ষার্থী চাকুরিতে যোগদানের পূর্বে অথবা চাকুরিতে যোগদানের পর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার সুযোগ পাবে। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে যেমন বি.এড প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ থাকে।
২. আরবিসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অন্য ভাষার বইগুলোতে ঐ ভাষার পাশাপাশি বাংলায় বইটির নাম ও কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে বইগুলো প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ।
৩. অন্তত সহকারী গ্রন্থাগারিক পদটিতে নিঃশর্তে সমমান যোগ্যতার সুযোগ রাখা এবং গ্রন্থাগারিক পদটির যোগ্যতাও কিছুটা শিথিল করা। কারণ অনেকে মাদ্রাসায় দাখিল ও আলিম পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন।

দেশের এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে জেনারেল শিক্ষিত ডিপ্লোমাধারীদের আরো হতাশ করেছে উক্ত পদদ্বয়ের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ।

সামগ্রিক দিক বিবেচনায়, মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নের ধারা নির্বিঘ্ন রাখতে এবং পদদুটিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌলিক যোগ্যতার প্রাধান্য রাখতে সনদের সমমান বিধান নিশ্চিত করা একান্ত জরুরী।এতে একদিকে যেমন শিক্ষার ভারসাম্য অবস্থা বজায় থাকবে, অন্যদিকে বেকার সমস্যা নিরসনেও তা ভূমিকা রাখবে।

অতএব সৃষ্ট বৈষম্য নিরসনে “বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮” এর ১৫নং কলামের গ্রন্থাগারিক এবং ৩৫নং কলামের সহকারী গ্রন্থাগারিক নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতায় সমমান বিধান পুনর্বহালের জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুনজর কামনা করছি।

লেখকঃ- মোঃ আবু বক্কর সিদ্দিক।
জেলাঃ জয়পুরহাট।
ডিপ্লোমা-ইন-লাইব্রেরি এন্ড ইনফরমেশন সায়েন্স।
শিক্ষাবর্ষঃ ২০১৮-২০১৯
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুকে লাইক দিন