২৮শে অক্টোবর, ২০২০ ইং, বুধবার, ১৩ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজঃ

আমি জানি না আমার লেখাটি গণশিক্ষা সচিব স্যারের চোখে পড়বে কি না!

দৈনিক বিদ্যালয় | ২০২০ |

আমি জানি না আমার লেখাটি গণশিক্ষা সচিব স্যারের চোখে পড়বে কি না!


আকরাম আল হোসেন, সিনিয়র সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারে যখন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি তখন আমি অনার্স সেকোন্ড ইয়ারে। পারিবারিক চাপ আর আমার আম্মার অসুস্থতার জন্যে চাকরীটা আমার জন্যে খুব জরুরী হয়ে পড়ে। এখন ও মনে আছে যে দিন সিলেট ডিপিইও অফিসে যোগদান করতে যাই সেদিন ডিপিইও স্যার আমাদের সবাইকে ডেকে বলেছিলেন চাকরি করতে হলে যে যেখানেই পড়ালেখা করেন না কেন তা বন্ধ করে দিতে হবে। আমাদের যত টুকু শিক্ষা দরকার তা আমরা পেয়ে গেছি। যদি কেউ তাও পড়ালেখা চালিয়ে যান আর আমাদের কানে খবর আসে তাহলে আমরা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবো। কথাটা শুনেই হার্টবিট যেন বেড়ে গেছিলো। চাকরিটা হওয়াতে যতটা আনন্দ হচ্ছিলো, তা যেন ম্লান হয়ে গেলো। আমি কথাটা শুনে স্যার এর রুম থেকে বের হয়ে কান্নাধরে দিলাম। আমার কান্না দেখে আমার সাথে যাওয়া স্যার এগিয়ে এসে কান্নার কারণ জানতে চাইলেন। আমি বললাম আমাদের নাকি পড়ালেখা ছেড়ে দিতে হবে।স্যার আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘আরে দূর বোকা… এগুলা তারা বলেই, তাই বলে কেউকি পাড়ালেখা ছাড়ে! সাহস পেলাম স্যার এর কথায়। চাকরি করছি সাথে পাড়ালেখাও।কোনদিন বলতে পারবো না আমার পড়ার জন্যে কোন একটা দিন আমার শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করেছি! বছরের ২০টা নৈমিত্তিক ছুটি ছিল সম্বল। হাজারো সমস্যা, জ্বর, সর্দি, মাথাব্যথা এগুলা নিয়েও স্কুল ছাড়ি নি। সেইদিন গুলোর কথা মনে পড়লে চোখে জল এসে যায়। আম্মার অসুস্থতা যখন বাড়লো সারা রাত আম্মা ব্যাথায় ঘুমাতেন না। আম্মার পাশে বসে যখন ফজরের আযান পড়তো সেই দিনগুলোতেও একটা ছুটি চাই নি; কারণ ছুটিগুলা রেখে দিতাম পরীক্ষার জন্যে। আম্মা যে দিন মারা যান সেদিন স্কুলের দেরি হবে বলে আম্মার থেকে বিদায় নেওয়া হয়নি। ক্লাসে ছিলাম বলে আম্মার বেশি শরীর খারাপ করছে সেই খবরটা ও ক্লাসশেষে জানতে পারি! পরে এসে আম্মাকে আর পাইনি! এতটা সেক্রিফাইস করেছি শুধু পড়ালেখা করবো আর আমার শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করবো না বলে।

আমার ডিপার্টমেন্ট হেড স্যার ক্লাস করতাম না বলে আমাকে একদিন ডাকান। আমি যখন সব বলি স্যার আমকে সুযোগ দেন। স্যারের আন্তরিকতার মূল্য দিতে কলেজের গ্রুপ থেকে ক্লাসের আপডেট নিতাম। রেজাল্ট খারাপ হয়নি।আমার সেই স্যার আজ নাই। কিন্তু আমি আমার স্যারের কাছে আজীবন ঋণী থাকবো।

চাকরীজীবনে আমি দুজন হেডটিচার পেয়েছি, উনারা আমাকে অনেক হেল্প করেছেন কারণ উনারা দেখতেন জাস্ট পরীক্ষাটা দিতে আমি আমার নৈমিত্তিক ছুটিগুলার কত কদর করতাম কতটা ছাড় দিতাম। এতটা কষ্টকরে অর্জন করা সার্টিফিকেট গুলা যখন লুকিয়ে রাখতে হয়, যখন নিজের নামের পাশে এইচ এস সি লিখতে হয়, অর্জিত সার্টিফিকেটগুলা যখন আলমারিতেই সীমাবদ্ধ রাখতে হয় এর থেকে কষ্ট আর কী হতে পারে!

আমি যে এই কথাগুলাও কোনদিন লিখতে পারবো, কোনদিন বলতে পারবো আমিও ডিগ্রীধারী তাও ভাবি নি। মাননীয় সচিব স্যারের আশ্বাসে আজ বলতে পারলাম। স্যারের কাছে আকুল আবেদন আপনি যখন মৌখিকভাবে বলেছেন আমাদের সার্টিফিকেট কাজে লাগবে, প্লিজ স্যার দ্রুত একটা পরিপত্র জারি করে আমার মত হাজারো শিক্ষকের গোপন কান্নার অবসান করেন!

– রুহামা ইয়াছমিন, সহকারী শিক্ষক, টুকেরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিশ্বনাথ, সিলেট।

(ডি.বি,আর.ই)

আরও পড়ুন- মাংস তরকারিতে লবণ বেশি হলে করণীয়

ফেসবুকে লাইক দিন